
সাঁওতাল সমাজের প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত এবং প্রথাভিত্তিক। (Roy, 1912) গ্রাম পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য আতু মড়ে হড় নিয়োগ করা হয়। আতু মড়ে হড় নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ, অপসারণ ও উত্তরাধিকার নির্ধারণে সাঁওতাল সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
আতু মড়ে হড় নিয়োগের মেয়াদ ও মাগ উৎসবের গুরুত্ব
সাঁওতালসমাজে গ্রামের আতু মড়ে হড় নিয়োগ সাধারণত এক বছরের জন্য হয়। (West Bengal GRS Association – About WBGRSA, 2026) প্রতি বছর মাগ উৎসবের সময় এই পদগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। মাগ উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সামাজিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গ্রামের মতো নয়, যেখানে পঞ্চায়েত বা প্রধানরা অনেক বছর ধরে দায়িত্বে থাকেন, সাঁওতাল সমাজে প্রতিবছর মূল্যায়ন ও নিয়োগের এই পদ্ধতি তাদের বিশেষ ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
এই সময় আতু মড়ে হড় জানান যে তাঁদের দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং তাঁরা পদত্যাগ করছেন। এরপর গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে আতু মড়ে হড়দের কাজ ও আচরণ নিয়ে আলোচনা করেন। সাধারণত আতু মড়ে হড়দের সততা, নিষ্ঠা, গ্রামবাসীদের প্রতি সহানুভূতি, আইন ও নিয়ম মানা এবং গ্রামের স্বার্থে কাজ করার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়।
জেবিনা ফ্লাভিয়াস গ্রিফিনের লেখা ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড ডেইলি লাইফ ইন বেঙ্গল’ (India and Daily Life in Bengal) গ্রন্থ অনুসারে, সাঁওতাল সমাজে গ্রামবাসীরা তাদের নেতাদের নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগের বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা করেন এবং এরপর সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে, ওই পদাধিকারীরা তাদের দায়িত্বে বহাল থাকবেন কি না—যা ওই সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার ঐতিহ্যকেই প্রতিফলিত করে।
‘মাঘ’ উৎসব চলাকালীন গ্রামবাসীদের ‘রাইস বিয়ার’ (চালের তৈরি পানীয়) পরিবেশন করা হয়; এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা, যা কেবল মানুষকে একটি সম্মিলিত ভোজের উদ্দেশ্যে একত্রিতই করে না, বরং গ্রামের ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিরও প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মাগ উৎসব ও সামাজিক জবাবদিহিতা
মাগ উৎসবের একটি বড় দিক হলো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ। যদি কোনো আতু মড়ে হড় দায়িত্বে অবহেলা করেন বা গ্রামের ক্ষতি করেন, তখন গ্রামবাসীরা সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করতে পারেন। (Magan Song, n.d.)
এই বৈঠকে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়:
- আতু মড়ে হড়দের কাজের মূল্যায়ন করা হয়
- অভিযোগ ও অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ থাকে
- প্রয়োজনে আতু মড়ে হড়কে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়
- যদি দরকার হয়, আতু মড়ে হড়কে অপসারণও করা হতে পারে (Soren, 2018, pp. 45-60)
ফলে সাঁওতাল সমাজে নেতৃত্ব সবসময় জনগণের আস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকে। (Alam, 1995, pp. 28-42)
আতু মড়ে হড় অপসারণের বিধান
সাঁওতাল সমাজে কোনো আতু মড়ে হড় যদি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করেন অথবা গ্রামের ক্ষতি সাধন করেন, তবে গ্রামবাসীরা তাঁকে পদচ্যুত করার অধিকার রাখে (Rahman & Rahman, 2018, pp. 1-12)।
অপসারণের প্রধান কারণসমূহ
- কুলহি দুড়ুপ না ডাকা হলে
- উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান অবহেলা করলে
- গ্রামের সম্পত্তি রক্ষা না করলে
- পতিত জমি বহিরাগতদের হাতে তুলে দিলে
- দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে
- সামাজিক নৈতিকতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে
যদি কোনো আতু মড়ে হড় সরকারি জমির মালিক হন বা রাজস্ব আদায়ের কাজে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁকে অপসারণের জন্য ডেপুটি কমিশনারের অনুমোদন লাগতে পারে। মাঞ্জিদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আরও বেশি কঠোরভাবে মানা হতো।
অসন্তুষ্ট গ্রামবাসীদের অভিযোগের উদাহরণ
সাঁওতাল সমাজে গ্রামের মানুষরা তাঁদের নেতার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারতেন। এতে দেখা যায়, নেতৃত্ব পুরোপুরি জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করত।
দুমিয়ার গ্রামের অভিযোগ
দুমিয়ার গ্রামের মানুষ তাঁদের মাঞ্জির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন কারণ তিনি কিছু বিষয় ঠিক করেননি।
- তিনি বার্ষিক উৎসব পরিচালনা করতেন না (Siddiqa, 2018, pp. 45-60)
- গ্রামের সমস্যা সমাধানে কুলহি দুড়ুপ ডাকতেন না (Islam & Rahman, 2018, pp. 1-10)
- পতিত জমি বহিরাগতদের হাতে দিচ্ছিলেন (Sharma, 2010, pp. 45-52)
- মাঞ্জিথান ও জাহেরথানের প্রতি অবহেলা করতেন
গ্রামবাসীরা বলেন–
“আমরা আমাদের মাঞ্জির উপর সম্পূর্ণ ভরসা করি, কিন্তু তিনি আমাদের কখনও তাঁর জ্ঞান দেন না।”
গাড়িগঞ্জ গ্রামের অভিযোগ
গাড়িগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন তাঁদের মাঞ্জি—-
- খাজনার রসিদ দেন না
- বাহা ও সোহরাই উৎসবে চাল বা চালের বিয়ার দেন না
- খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের পর সমাজের রীতিনীতি মানছেন না
- গ্রামের সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করছেন
এই অভিযোগগুলো থেকে বোঝা যায় যে সাঁওতাল সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। (Roy, 1953, pp. 1-20)
বাচা গ্রামের ঘটনা
বাচা গ্রামের মাঞ্জি সুরাই কিস্কু কিছু ভুল করার কারণে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস হারান।
- তাঁর পরিবার গ্রামের রাস্তা এবং পতিত জমি দখল করেছিল। (Hunter, 1876)
- তাঁর ভৃত্যেরা অন্যের জমিতে গবাদি পশু চরাতো। (Chakravarty, 1984)
- তিনি গ্রামের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীরা তাঁকে পদচ্যুত করে এবং তাঁর জমির অধিকার উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দেয়। (চক্রবর্তী, 2018)
আতু মড়ে হড়ের উত্তরাধিকার ও নিয়োগ পদ্ধতি
যদি মড়ে হড়ের কোনো সদস্য মারা যান, পদত্যাগ করেন বা বরখাস্ত হন, তখন কুলহি দুড়ুপ একজন নতুন উত্তরাধিকারী নির্বাচন করেন। (ডো, 2020, pp. 45-67)
প্রধান কর্মকর্তার নিয়োগ
যদি পদটি “প্রধান” বা মাঞ্জির মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। (The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, 1972)
- এই ক্ষেত্রে মহকুমা কর্মকর্তা সভায় উপস্থিত থাকেন। (বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো, 2019)
- এছাড়া, জেলা প্রশাসক নিয়োগ অনুমোদন করেন। (Bangladesh Civil Service (Administration) Rules, 2014, n.d.)
তবে অন্যান্য পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রামের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত ধরা হয়। (Islam & Rahman, 2019, pp. 1-10)
বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ব্যবস্থা
সাঁওতাল সমাজে বেশিরভাগ পদ বংশানুক্রমে হস্তান্তরিত হতো। (Samanta, 2018) সাধারণত পরিবারের বড় ছেলেকেই উত্তরাধিকারী ধরা হতো।
তবে যদি নিচের যেকোনো একটি ঘটে,
- উত্তরাধিকারী অযোগ্য হন,
- অসুস্থ হন,
- সমাজের আস্থা না পান,
তাহলে গ্রামবাসীরা অন্য কাউকে নির্বাচন করতে পারতেন।
উদাহরণ
দলদালির দারিয়া সোরেন
অনেকেই দারিয়া সোরেনকে বিশ্বাসঘাতক মনে করতেন। (Jirati, 2018) তিনি মারা গেলে গ্রামবাসীরা তাঁর ছেলের পরিবর্তে ছোট ভাইকে নেতা হিসেবে বেছে নেয়।
খেজুরখালের ঘটনা
মাঞ্জি সোরেন ছিলেন কাসুন সোরেনের বড় ছেলে। কিন্তু তিনি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ায় গ্রামবাসীরা তাঁকে নেতা না করে তাঁর ছোট ভাইকে দায়িত্ব দেন। (Mozumdar et al., 2008, pp. 1-10)
নায়কে এবং কুডাম নায়কে নিয়োগের বিশেষ নিয়ম
সাঁওতাল সমাজে নায়কে এবং কুডাম নায়কে নিয়োগের প্রক্রিয়া অন্য আতু মড়ে হড়দের তুলনায় বেশি জটিল ছিল। (Roy, 1912)
উপ-গোষ্ঠীভিত্তিক নিয়ম
কিছু নির্দিষ্ট উপ-গোষ্ঠী থেকে নায়কে এবং কুডাম নায়কে নির্বাচন করা হতো না। (Roy, 1953) উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,
- নি মুরমু
- নি সোরেন
- নাজ মারান্ডি
এই উপ-গোষ্ঠীগুলোকে উপযুক্ত মনে করা হতো না।
এছাড়া, যদি নায়কে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হন, তাহলে একই গোষ্ঠীর কিছু উপশাখা থেকেও তাঁকে নির্বাচন করা যেত না। (Roy, 1912)
বোঙ্গাদের মাধ্যমে পুরোহিত নির্বাচন
সাঁওতালধর্মে মনে করা হয়, নতুন পুরোহিত নির্বাচন শুধু মানুষের কাজ নয়, বোঙ্গারাও এতে অংশ নেন। (Banka, 2023)
নির্বাচন প্রক্রিয়া
- গ্রামের সবাই মাঞ্জিথানে একত্রিত হন। (Schulte-Droesch, 2018)
- বেদীতে নতুন কুলো ও চাল রাখা হয়। (Roy, 1912)
- মারাং বুরু, জাহের এরা ও অন্য বোঙ্গাদের ডাকা হয়। (Buri – Codex, n.d.)
- এরপর বোঙ্গারা একজন ব্যক্তির ওপর ভর করেন। (Correspondent, 2016)
- তখন সেই ব্যক্তিকে পুরোহিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। (Schulte-Droesch, 2018)
যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে জাহের এরার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত ধরা হয়। নির্বাচিত ব্যক্তি এই দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে পারেন না। (Mitra & Jha, 2018, pp. 47-58)
সাঁওতাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য
সাঁওতাল সমাজে নিয়োগ ও অপসারণের এই পদ্ধতি থেকে বোঝা যায়, আদিবাসী সমাজেও গণতন্ত্র ও সামাজিক জবাবদিহিতার ধারণা ছিল। (Roy, 1953)
এই ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য
- জনগণের মতামতের গুরুত্ব
- নেতৃত্বের মূল্যায়ন
- সামাজিক জবাবদিহিতা
- ধর্ম ও প্রশাসনের সমন্বয়
- যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন
- সামাজিক আস্থা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা
উপসংহার
সাঁওতাল সমাজে আতু মড়ে হড়দের নিয়োগ, অপসারণ এবং উত্তরাধিকার প্রথা একটি সুসংগঠিত ও ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর পরিচয় দেয়। (Smith & Doe, 2018, pp. 123-145) মাগ উৎসবে নেতৃত্বের মূল্যায়ন, জনগণের অভিযোগ শোনা এবং অযোগ্য আতু মড়ে হড়দের অপসারণের সুযোগ সমাজের সামাজিক গণতন্ত্র ও নৈতিক শাসনের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
মাঞ্জি, পারানিক, নায়কে ও অন্যান্য কর্মকর্তারা শুধু প্রশাসনিক ব্যক্তি নন, তাঁরা সমাজের ঐক্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক ন্যায়বোধের রক্ষকও। (Mandal, 2018, pp. 432-434) আজও এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা আদিবাসী আইন, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং লোকসংস্কৃতি গবেষণার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।