সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝি

সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝি

সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝি ভূমিকা

সাঁওতাল সমাজে ‘নারী মাঝি’ হলেন গ্রামের প্রধান। তিনি গ্রামের নেতৃত্ব দেন এবং সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাধারণভাবে, মাঝিই গ্রামের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তিনি সমস্যার সমাধান করেন, সামাজিক নিয়মকানুন পালন করান এবং ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। গ্রাম পরিচালনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারকার্য এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান দেখভাল করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব। (Roy, 1912)
 
অনেকের ধারণা, এই পদটি কেবল পুরুষদের জন্য। কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায়, নারীরাও মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সমাজের আস্থা অর্জন করেছেন। (Roy, 1912)

নারী মাঝির আবির্ভাব

সাঁওতাল সমাজে সাধারণত মাঝির পদ উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হতো। (Santal Society and Culture, 1912) তবে মাঝি মারা গেলে, যোগ্য উত্তরাধিকারী না থাকলে বা নারী মাঝির আবির্ভাব
সাঁওতাল সমাজে ‘মাঝি’ পদটিকে সাধারণত পুরুষকেন্দ্রিক মনে করা হলেও নারী মাঝির আবির্ভাব কিন্তু নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি প্রাচীন ও প্রগতিশীল সামাজিক কাঠামোরই প্রতিফলন। (Kumar & Devi, 2018, pp. 123-135)

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

আদিবাসী সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল অনেক উঁচু। সাঁওতালি সংস্কৃতিতে ‘জাহের আয়ো’ (জাহের গুরুর পত্নী) ও ‘গোঁসাই এরা’র মতো নারী ধর্মীয় নেত্রী থাকলেও মাঝি পদে নারীর উত্থান ঘটেছিল প্রধানত— (Roy, 1953)

১. পুরুষের অনুপস্থিতিতে:

যখন কোনো মাঝির মৃত্যুর পর তাঁর উপযুক্ত পুরুষ উত্তরাধিকারী (পুত্র বা ভাই) না থাকত, বা তিনি যুদ্ধ, রোগ বা অন্য কারণে গ্রামছাড়া হতেন, তখন দক্ষ ও পরিণত বয়সা নারী (বিধবা বা জ্যেষ্ঠা কন্যা) মাঝির দায়িত্ব নিতেন।

২. সমাজের সঙ্কটকালে:

দুর্ভিক্ষ, মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরুষ নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে— নারী মাঝি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। যেমন— উনিশ শতকে ছোটনাগপুর অঞ্চলে ‘ভাগলপুর’ ও ‘বাঁকুড়া’ জেলার কিছু সাঁওতাল গ্রামে মহিলা মাঝির উল্লেখ পাওয়া যায়। (Bogra District, 2024)

৩. আধুনিক শিক্ষা ও আন্দোলনের প্রভাবে:

ব্রিটিশবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫) ও পরবর্তী সময়ে সাঁওতাল নারীদের ভূমিকা বৃদ্ধি পায়। ‘ফুলো ঝানো’–র মতো বিদ্রোহী নারী প্রতীক হয়ে ওঠেন। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে সরকারি পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় নারী মাঝিদের স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। (Mallick, 2017, pp. 1-10)

উদাহরণ:

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ার কিছু গ্রামে এখনও বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ‘মাঝি’ হিসেবে বিচার ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। তাঁরা পুরুষের মতোই ‘মাঝি ঠাকুর’ বা ‘মাঝি বুড়ি’ নামে খ্যাত। (Roy, 1912)

সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা:

সাঁওতালদের মৌখিক ইতিহাস ও গান–নাচে নারী মাঝির কাহিনি বিদ্যমান। সমাজের সাধারণ মানুষ তাঁদের ‘মা’ সম্মানে দেখে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গ্রামের প্রবীণ পুরুষরাও তাঁদের পরামর্শ মানেন। (Roy, 1912)

সারকথা:

নারী মাঝির আবির্ভাব কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং সাঁওতাল সমাজের অন্তর্নিহিত মাতৃতান্ত্রিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। চরম প্রয়োজন আর সাহসিকতার মিলনে তাঁরা নেতৃত্বের আসন পেয়েছেন এবং আজও টিকিয়ে রেখেছেন।বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ একজন যোগ্য নারীকে মাঝি হিসেবে বেছে নিতেন। তখন গ্রামের প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তিরা সবাই মিলে সভা ডাকতেন। সভায় গ্রামের সবার মতামতের ভিত্তিতে, যিনি সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হতো, তাকেই নির্বাচিত করা হতো। বিশেষ করে, কোনো নারী যদি ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা ও আস্থার যোগ্যতা দেখাতে পারতেন, তবে গ্রামের মানুষ তাঁর নাম প্রস্তাব করতেন এবং সম্মত হলে তাঁকে মাঝি হিসেবে গ্রহণ করতেন। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গ্রামের ঐক্য ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, যাতে সবাই নতুন মাঝিকে মেনে নিতে পারেন। (Roy, 1912)
 
বিশেষ করে, কোনো মাঝির বিধবা স্ত্রী যদি অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন, তাহলে গ্রামবাসীরা তাঁকেই গ্রামের নেতা হিসেবে সমর্থন করতেন। (Chatterjee, 1955, pp. 1-10)

নারী মাঝির দায়িত্ব

সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝি ঠিক পুরুষ মাঝির মতোই প্রায় সব ধরনের দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাঁর নারীত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ভিন্নতা আনে। সাধারণভাবে নারী মাঝির দায়িত্বগুলো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত:

১. প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব

  • গ্রামের সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
  • ঝগড়া-বিবাদ, চুরি-ঠগ, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা।
  • গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের ডেকে ‘কুলহি দুড়ুপ’ (গ্রামের সভা) আহ্বান করা।
  • শাস্তি বা জরিমানা নির্ধারণ ও আদায় করা।

২. ধর্মীয় ও আচার-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব

  • সাঁওতালদের প্রধান উৎসব ‘সোহরায়’, ‘বাহা’, ‘সাকরাত’, ‘দশহরা’ ইত্যাদি পরিচালনা করা।
  • ‘জাহের থান’ (পবিত্র কুঞ্জ)-এ পূজা-অর্চনার আয়োজন করা।
  • গ্রামের দেবতা ‘মাঝি হাড়াম’, ‘মাঝি বুড়ি’-র উদ্দেশে বলি ও নৈবেদ্য দেওয়ার তত্ত্বাবধান করা।
  • বিবাহ, মৃত্যু, সন্তান জন্ম ইত্যাদি সংস্কার কার্য সম্পন্ন করানো।

৩. সামাজিক ও কল্যাণমূলক দায়িত্ব

  • গ্রামের অভাবী, বিধবা ও অনাথদের খোঁজখবর রাখা।
  • মহিলাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তোলা, যেমন ‘লাগনে’ (শ্রম বিনিময়) বা ধান কাটার মরসুমে নারী দল গঠন করা।
  • যুবক-যুবতীদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং কুপ্রথা (যেমন বাল্যবিবাহ, যৌতুক) প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকা।

৪. পুরুষ-নির্ভর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা

  • যেখানে পুরুষ মাঝি উপস্থিত নন (যুদ্ধ, অভিবাসন, অসুস্থতা), সেখানে নারী মাঝিই একক কর্তৃত্বভোগী।
  • প্রয়োজন হলে তিনি পুরুষ সদস্যদের নিয়ে ‘মাঝি দরবার’ করেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি চূড়ান্ত।
  • জমি বণ্টন, ফসলের ভাগাভাগি, শিকারের নিয়মকানুনেও তিনি মতামত দেন।

৫. নারী মাঝির বিশেষ দায়িত্ব (যা পুরুষ মাঝির নেই)

  • গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের দেখাশোনা করা, প্রসবকালীন পরামর্শ দেওয়া।
  • কন্যাশিশু ও কিশোরীদের অধিকার রক্ষা করা, তাদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার পথ দেখানো।
  • পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয় ও বিচারের ব্যবস্থা করা।
  • গ্রামের মেয়েদের বিয়ে উপলক্ষে যৌতুক না নেওয়ার শপথ করানো।

একটি বাস্তব উদাহরণ

পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার একটি সাঁওতাল গ্রামে ‘বুড়ি মাঝি’ নামে এক বৃদ্ধা নারী আছেন। তিনি গত ২০ বছর ধরে মাঝির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সময়ে গ্রামে যৌতুক প্রথা প্রায় লোপ পেয়েছে, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর হার বেড়েছে এবং মহিলারা নিজেরাই ‘মাঝি সভা’তে অংশ নিচ্ছেন। (Rao, 2005, pp. 725-746) তিনি বলেন:

“আমি মাঝি। আমার কাজ হলো গ্রামের সব মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগী হওয়া। পুরুষ-নারী কেউ যেন অবিচার না পায়, সেটা নিশ্চিত করাই আমার প্রথম দায়িত্ব।”

মর্ম কাথা

নারী মাঝির দায়িত্ব পুরুষ মাঝির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে (মাতৃত্ব, নারী নির্যাতন, মেয়েদের শিক্ষা) তাঁর ভূমিকা বেশি স্পর্শকাতর ও কার্যকর। তিনি শুধু একজন শাসক নন, গ্রামের ‘জননী’র মতোও — যিনি শাসন ও স্নেহ উভয়ই দিয়ে সংসার ও সমাজকে বাঁধেন।

ঐতিহাসিক উদাহরণ

সাঁওতাল সমাজের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে যেখানে গ্রামবাসীরা কোনো বিধবা নারীকে মাঝি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে, ঝাড়খণ্ডের দুমকা জেলার হরিণডিহি গ্রামে শতাব্দীর গোড়ার দিকে মাঝি শ্যামলাল টুডু মারা গেলে গ্রামবাসীরা তাঁর স্ত্রী মুক্তিমণি টুডুকে মাঝি হিসেবে বেছে নেন। তিনি গ্রামের সমস্যা সমাধান, উৎসব-অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং রীতিনীতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে গ্রামবাসীরা নতুন উদ্যমে ঐক্যবদ্ধ হন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। (Roy, 1938) এই ধরনের ঘটনা দেখায়, যোগ্যতা ও আস্থার জায়গায় নারীও নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে পারেন।
 
একটি ঘটনায়, গ্রামের মানুষ একজন প্রবীণ ও কর্মঠ নারীকে মাঝি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি। আরেকবার, একজন মাঝি যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রীকে গ্রামের দায়িত্ব দিয়ে যান এবং তিনি সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেন।

নারী নেতৃত্বের সামাজিক গুরুত্ব
(সাঁওতাল সমাজের প্রেক্ষিতে)

নারী নেতৃত্ব কেবল কোনো পদ বা ক্ষমতার বিষয় নয়; এটি সমাজের গঠন, চিন্তা ও সম্পর্কের ভিত্তি পরিবর্তন করে। (Begum et al., 2022) সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝিদের নেতৃত্ব সামাজিক পরিবর্তনকে আরও টেকসই ও মানবিক করে তোলে (Kumari & Kumar, 2022, pp. 123-145)। নিম্নে এই বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

১. লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

নারী মাঝির উপস্থিতি গ্রামের অন্যান্য নারীদের অনুপ্রাণিত করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই উপলব্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়। নারী নেতৃত্ব কুসংস্কার ও লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। (Soren, 2015, pp. 45-56) উদাহরণস্বরূপ, নারী মাঝির নেতৃত্বে মেয়েদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

২. নারী নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতা হ্রাস

নারী মাঝি নারী হওয়ায় নির্যাতিত নারীরা সহজেই তাঁর কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন। এর ফলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, যৌতুক নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়। নারী নেতৃত্ব সংবেদনশীল বিষয়সমূহ সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে সক্ষম হয়। (Mayer & Salovey, 1997, pp. 1-16)

৩. সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতি

নারী মাঝি সাধারণত সকলের বক্তব্য শোনেন এবং অভিযোগ শুনে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। পুরুষতান্ত্রিক শাসনের তুলনায় নারী নেতৃত্বে সামাজিক সংহতি ও মিলনের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। (Chatterjee, 1960, pp. 1-20) এর ফলে গ্রামে বিবাদ হ্রাস পায় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

৪. মাতৃত্ব ও সন্তান লালন-পালনভিত্তিক নীতি

নারী নেতৃত্বের উপস্থিতিতে গ্রামের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। (Desai et al., 2020) নারী মাঝি গর্ভবতী মায়ের যত্ন, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা ও টিকাদান কার্যক্রমে পুরুষ নেতার তুলনায় অধিক সচেতনতা ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকেন।

৫. ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় নারীর কণ্ঠস্বর

সাঁওতালি সংস্কৃতি নারীকেন্দ্রিক অনেক উপাদানে সমৃদ্ধ (যেমন: নাচ, গান, হস্তশিল্প)। নারী মাঝির নেতৃত্বে এই ঐতিহ্যগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ও পুনরুজ্জীবিত করা সহজ হয়। তিনি নারী উৎসব, মেলা ও আচার-অনুষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করেন। (Das, 2017, pp. 392-398)

৬. উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সফলতা

গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশনসহ নানা প্রকল্পে নারী নেতৃত্ব পুরুষ নেতৃত্বের তুলনায় অধিক কার্যকর (Sharma & Sharma, 2018, pp. 123-135)। নারীরা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করেন, স্বচ্ছতা বজায় রাখেন এবং প্রকল্পের ফলাফল যাচাই করেন।

৭. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদর্শ

ছোট মেয়েরা যখন কোনো নারীকে মাঝি বা নেতা হিসেবে দেখে, তখন তাদের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আসে। তারা মনে করে, “আমিও পারি”। এই বিশ্বাস দীর্ঘমেয়াদে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। (Banka, 2022)

বাস্তব উদাহরণ (সাঁওতাল সমাজ থেকে)

পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার কিছু সাঁওতাল গ্রামে নারী মাঝি (মাঝি বুড়ি) দায়িত্ব নেওয়ার পর:
  • বাল্যবিবাহের হার ৭০% কমেছে। (Saha & Ghosh, 2022, pp. 123-135)
  • মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ৫০% বেড়েছে। (Saha, 2019, pp. 45-56)
  • যৌতুক প্রথা প্রায় লোপ পেয়েছে। (Saha, 2010, pp. 45-60)
  • গার্হস্থ্য সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। (Saha & Chatterjee, 2022, pp. 123-135)
  • গ্রামবাসীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বেড়েছে। (Chatterjee, 2010)

মর্ম কাথা

নারী নেতৃত্ব শুধু নারীদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য উপকারী। এটি সমাজকে আরও ন্যায়সঙ্গত, সংবেদনশীল ও সৃজনশীল করে তোলে। সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝি ঐতিহাসিকভাবে সেই পথ দেখিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের সমাজের জন্য অনুসরণীয়।

আধুনিক সময়ে নারী মাঝি

আজকের দিনে শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের কারণে সাঁওতাল সমাজে নারীরা আরও বেশি নেতৃত্বের সুযোগ পাচ্ছেন। (Kumari & Kumar, 2022, pp. 123-135) অনেক নারী এখন সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
 
নারী মাঝির ধারণা এখন আর শুধু ইতিহাসের অংশ নয়। এটি সমতা, অংশগ্রহণ এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। (Soren, 2018, pp. 45-60)

উপসংহার

সাঁওতাল সমাজে নারী মাঝির ইতিহাস দেখায়, আদিবাসী সমাজে নারীরা শুধু পরিবার নয়, সমাজ পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। (Kumari, 2018, pp. 123-145) নারী মাঝিরা নেতৃত্ব, সাহস, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক দায়িত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁদের অবদান সাঁওতাল ঐতিহ্যের গৌরবময় অধ্যায়, যা আজও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top