মাঝি পারগানা ব্যাবস্থা ও সাঁওতাল আইন

মাঝি পারগানা

মাঝি পারগানা ব্যাবস্থা পুরো সাঁওতাল সমাজের সম্মিলিত একটি প্রতিষ্ঠান। ডব্লিউ.জি. আর্চার বলেছেন, সাঁওতালদের প্রথাগত আইনের একটি উন্নত ব্যবস্থা আছে, যা তাদের বিশ্বাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। (Archer, 1984) কোনো আইন কার্যকরভাবে চলতে হলে এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য হতে হলে, সবার সম্মিলিত অনুমোদন ও আনুগত্য দরকার। তাই মাঝি পারগানা ব্যাবস্থাকে পুরো আদিবাসী সমাজের সৃষ্টি হিসেবে দেখা হয়।

 এই আইনি কাঠামো শুধু গ্রামের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আঞ্চলিক স্তরে বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনাও তুলে ধরে। অন্যান্য আদিবাসী সমাজের নিয়ম বা আধুনিক রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার তুলনায়, সাঁওতাল মাঝি পারগানা ব্যাবস্থা বেশি অংশগ্রহণমূলক এবং সামাজিক ঐক্য রক্ষায় গুরুত্ব দেয়।
 
 যেখানে রাষ্ট্রের লিখিত আইন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অধিকারের ওপর জোর দেয়, সেখানে সাঁওতাল আদালত সমষ্টিগত ঐক্য ও সামাজিক পুনর্মিলনের ওপর গুরুত্ব দেয়। মাঝি পারগানা ব্যাবস্থা গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আদিবাসী আদালত হিসেবে সামাজিক মনোভাব ও ন্যায়বিচার প্রতিফলিত করে।

কুলহী দুড়ুপ : মাঝি পারগানা ব্যাবস্থার প্রথম স্তর

মাঝি পারগানা ব্যাবস্থার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো কুলহী দুড়ুপ। এটি সাঁওতাল বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি এবং গ্রামের ভেতরে যেকোনো বিরোধ বা সামাজিক সমস্যার প্রথম বিচার এখানেই হয়। তাই একে আদিবাসী বিচারের ‘প্রাথমিক আদালত’ বলা যায়। 
কুলহী দুড়ুপ এর  প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
  • জন্ম, দীক্ষা ও মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা
  • বার্ষিক উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ
  • বহির্বিবাহের নিয়ম যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করা
  • সামাজিক বিধি ও নৈতিকতা রক্ষা করা
  • গ্রামবাসীর নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ করা
  • প্রথাগত আইন কার্যকর রাখা
কুলহী দুড়ুপ শুধু বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সামাজিক, ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক কাজেরও কেন্দ্র। অনেক সময় এটি নিবন্ধন আদালত হিসেবেও কাজ করে, যেখানে দত্তক গ্রহণ, সম্পত্তি ভাগ, জমি হস্তান্তর বা সামাজিক অনুমোদনের মতো বিষয় স্বীকৃতি পায়। (Sinha, 1970) তবে, নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ সাধারণত সীমিত, কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নেতৃত্বের প্রধান পদগুলো পুরুষদের হাতে থাকে। 
 
নারীরা সরাসরি বিচারক বা প্রশাসক না হলেও, অনেক সময় তারা পারিবারিক বা সামাজিক সিদ্ধান্তে পরোক্ষভাবে মতামত দেন। সম্প্রতি কিছু জায়গায় নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তবে এটি এখনো সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি।

আতু মড়ে হড়

কুলহী দুড়ুপ মূলত আতু মড়ে হড় নামের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার নেতৃত্বে চলে। আইন অনুযায়ী, তাঁরা সমাজের সেবক হিসেবে গণ্য হন, তবে গ্রামের প্রশাসন, আইন রক্ষা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। (Doe & Smith, 2020, pp. 123-145)
এই কর্মকর্তাদের সততা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ওপর গ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। (Roy, 1915) তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন মাঞ্জি, যিনি বিচারসভায় সভাপতিত্ব করেন এবং গ্রামের প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন।

আতু মড়ে হড় ও তাঁদের ভূমিকা

সাঁওতাল সমাজে গ্রামের প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলেন মাঞ্জি বা গ্রামপ্রধান। (Roy, 1912) তিনি গ্রামের প্রধান কর্মকর্তা এবং সমাজের অভিভাবক হিসেবে গণ্য হন। যেসব গ্রামে সমগ্র গ্রামবাসী খাজনা প্রদান করে, সেখানে মাঞ্জিই সেই খাজনা সংগ্রহ করে জমা দেন। গ্রামের সমস্ত পতিত জমি, পরিত্যক্ত জোত এবং সাম্প্রদায়িক সম্পত্তি তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকে।

গ্রামের কূপ, রাস্তা, বাঁধ, চারণভূমি ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাঁর উপর বর্তায়।
 (Behera, 2026) প্রয়োজনে তিনি গ্রামের শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে এই সম্পত্তিগুলোর মেরামত করাতে পারেন। 

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মাঞ্জিথান বা গ্রামের প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতিস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ করেন এবং জাহের বা পবিত্র উপবনের তত্ত্বাবধান করেন। যদি উপবন নষ্ট বা বিরল হয়ে যায়, তবে তাঁকে নতুন গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করতে হয়।

যদি কোনো বোঙ্গার পবিত্র গাছ মারা যায়, তবে নায়কের সাহায্যে সেই বোঙ্গাকে অন্য গাছে স্থানান্তর করার ব্যবস্থা করতে হয়। (Marandi & Bodra, 2021) কোনো মৃত পবিত্র গাছ অপসারণের দায়িত্বও তাঁর। 

ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি তিনি নিশ্চিত করেন যে গ্রামের সমস্ত উৎসব, যজ্ঞ, জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহসংক্রান্ত অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে এবং গ্রামের প্রতিটি পরিবার তাতে অংশগ্রহণ করছে। (Hutton, 1921) গ্রামে মহামারী বা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়লে তিনি সভা ডাকেন এবং বিশেষ বলিদানের আয়োজন করেন।

যখন কোনো বিবাদ বা সামাজিক অপরাধ ঘটে, তখন মাঞ্জি গ্রামের সভা আহ্বান করেন এবং বিচারকার্যে সভাপতিত্ব করেন। আলোচনার শেষে তিনি গ্রামের মতামত ঘোষণা করেন এবং সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। গুরুতর অপরাধ ঘটলে অপরাধীকে আটক করে সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানানোও তাঁর দায়িত্ব। (Roy, 1912)
 
সাঁওতাল সমাজে মাঞ্জিকে কেবল প্রশাসক নয়, বরং গ্রামের রক্ষক ও পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। গ্রামবাসীরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করে এবং অনেক সময় তাঁকে “গ্রামের পিতা” বলা হয়। (Roy, 1912) তাঁর মৃত্যুতে গোটা গ্রামে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, কারণ নতুন মাঞ্জি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত গ্রাম প্রশাসনে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

পারানিক: মাঞ্জির সহকারী

মাঞ্জির পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হলেন পারানিক। তিনি মাঞ্জির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। মাঞ্জি না থাকলে তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং দরকার হলে গ্রামের নেতৃত্ব নেন। কোনো মাঞ্জি উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা গেলে অনেক সময় পারানিক অস্থায়ীভাবে মাঞ্জির পদে থাকেন।
পারানিকের প্রধান কাজগুলোর একটি হলো খাজনা আদায়ে সাহায্য করা। এজন্য তাঁকে অনেক সময় রাজস্বসংক্রান্ত সহকারীও বলা হয়। (Paranic: Significance and symbolism, 2026) (The Santal Village: A Model of Tribal Governance and Social Harmony, 2023)

জগ মাঞ্জি: যুবসমাজের নৈতিক রক্ষক

গ্রামের প্রধানের দ্বিতীয় সহকারী হলেন জগমাঞ্জি। তিনি গ্রামের তরুণ-তরুণীদের নৈতিক আচরণের রক্ষক। (Understanding Santal Social Norms: Codes of Behaviour and Taboos, 2023) তাঁর কাজ অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং সমাজে কোনো কেলেঙ্কারি বা বিশৃঙ্খলা না হয় তা নিশ্চিত করা।

কোনো অবিবাহিত মেয়ে গর্ভবতী হলে দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব জগ মাঞ্জির। তিনি তা না পারলে সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। (Hutton, 1921)
সোহরাই উৎসবে গ্রামের যুবক-যুবতীরা কয়েকদিন জগ মাঞ্জির তত্ত্বাবধানে থাকে এবং তাঁদের আচরণের দায়িত্ব তাঁর। (Roy, 1912) জন্ম ও বিয়ের মতো অনুষ্ঠানেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আগে জগ মাঞ্জির ক্ষমতা বেশি ছিল এবং তিনি কঠোর নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন তাঁর ক্ষমতা কিছুটা কমলেও গ্রামের যুবসমাজ তাঁকে এখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে করে।
 
অনেক সময় কোনো মেয়ে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রেমের বিষয় জগ মাঞ্জিকে গোপনে জানাত এবং তাঁর নীরবতার জন্য উপহার বা অর্থ প্রদান করত। যুবকেরাও একইভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত। (Roy, 1912) এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে জগ মাঞ্জি শুধু নৈতিক রক্ষকই নন, বরং যুবসমাজের গোপনীয়তার রক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন।

জগ পারানিক ও গডেৎ

জগ মাঞ্জির পরে আরও দুজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা আছেন: জগ পারানিক এবং গডেৎ। (Roy, 1915)

সাঁওতাল আইন ও সামাজিক ঐক্য

সাঁওতাল বিচারব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সামষ্টিক চরিত্র। এখানে বিচার ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা শাস্তির জন্য নয়, বরং সমাজে শান্তি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনার জন্য হয়। এজন্য বিচারপ্রক্রিয়ায় গ্রামের সাধারণ সদস্যদের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। (Sinha, 1977) সাধারণত, কোনো বিরোধ বা সমস্যা হলে, উভয় পক্ষ, গ্রাম্য প্রধান এবং আগ্রহী গ্রামবাসীরা নির্ধারিত স্থানে একত্রিত হন। 

গ্রামের সদস্যরা সাক্ষ্য দেন, যুক্তি তুলে ধরেন বা মতামত প্রকাশ করেন। বিচারকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উপস্থিত সবার মতামত শোনা হয় এবং অনেক সময় উন্মুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান নির্ধারিত হয়। এইভাবে, সমাজের সব পক্ষের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয় এবং সামাজিক ঐক্য বজায় থাকে।
 
এই ব্যবস্থায় আইন, ধর্ম, সামাজিক নৈতিকতা ও প্রশাসন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সাঁওতাল দের মাঝি পারগানা মহল শুধু বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পুরো সমাজের ঐক্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও আইনি ব্যবস্থার প্রভাব মাঝি পারগানা মহলের কাজ ও কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছে। অনেক এলাকায় সরকারি আইনের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখে কাজ করছে এবং কিছু সম্প্রদায়ে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণের মতো নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্য ধরে রেখেও আধুনিকতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top