ভূমিকা

“হুল মাহা” বা “সাঁওতাল হুল” ভারতের ইতিহাসের এক গৌরবময় ও বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ শাসন, জমিদারি প্রথা ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। (Sanyal, 1957) ‘হুল’ শব্দের অর্থ ‘বিদ্রোহ’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধ’। প্রতি বছর ৩০ জুন ‘হুল দিবস’ হিসেবে এই বিদ্রোহের স্মরণে পালিত হয়। সাঁওতালি ভাষায় একে ‘ᱦᱩᱞ ᱢᱟᱦᱟ’ (হুল মাহা) বলা হয়। এই লেখায় আমরা হুল মাহার ইতিহাস, কারণ, ঘটনাবলী, নেতৃত্ব, ফলাফল ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
ঐতিহাসিক পটভূমি
অঠারোশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে শাসন আরও শক্ত করতে নতুন রাজস্ব ও ভূমি ব্যবস্থা চালু করে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চালু করেন। (Adam, 1829) এতে জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারের কাছে রাজস্ব দিতে বাধ্য হন এবং কৃষকদের ওপর বেশি কর চাপান। সাঁওতালরা তখন মূলত বনজীবী ও স্থানান্তরিত চাষি ছিল। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে ঝুম চাষ করত এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভর করত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবস্থা ভেঙে যায়। জমিদাররা সাঁওতালদের জমি দখল করে নেয় এবং তাদের বর্গা চাষি বা দিনমজুরে পরিণত করে।
উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে সাঁওতালরা বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাস করত। ব্রিটিশ শাসকরা সাঁওতাল পরগনায় কঠোর শোষণমূলক নীতি চালু করে। জমিদার, মহাজন ও নীলকরদের অত্যাচারে সাঁওতালরা চরম দুর্দশায় পড়ে। তাদের কাছ থেকে জোর করে কর নেওয়া, জমি কেড়ে নেওয়া এবং মহাজনদের উচ্চ সুদের ফাঁদে ফেলা হতো। এই শোষণের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা অনেক দিন ধরে প্রতিবাদ করলেও তেমন কোনো ফল হয়নি।
হুল বিদ্রোহ ও তার কারণ
১৮৫৫ সালে ভারতের বিহার ও বাংলার সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে সাঁওতালদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক হুল বিদ্রোহ ঘটে। (Santal Rebellion, 2019) এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসন এবং তাদের সহযোগী জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের সংগঠিত প্রতিক্রিয়া।
হুল বিদ্রোহের পেছনে ছিল একাধিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ:
প্রথমত, ব্রিটিশদের ভূমি রাজস্ব নীতি ও জমিদারি প্রথা সাঁওতালদের জীবিকা ও জমির অধিকার কেড়ে নেয়। তারা তাদের পৈত্রিক জমি হারিয়ে জমিদারদের অধীনে বর্গাচাষি বা শ্রমিক হতে বাধ্য হয়। (Santhal Uprising in Birbhum, 1855, 2023)
দ্বিতীয়ত, মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের ওপর কঠোর শোষণ চালাত। তারা কম দামে ফসল কিনে নিত এবং বেশি সুদে ঋণ দিয়ে সাঁওতালদের ঋণগ্রস্ত করে রাখত। (Sinha, 1965, pp. 423-438)
তৃতীয়ত, ব্রিটিশ পুলিশ ও দারোগাদের অত্যাচারে সাঁওতালদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তারা জমিদার ও মহাজনদের পক্ষ নিয়ে সাঁওতালদের ওপর নির্যাতন করত। (বেঙ্গল পুলিশ ম্যানুয়েল, 1943)
চতুর্থত, নীলকর সাহেবরা সাঁওতালদের জমি জোর করে দখল করে নীল চাষে বাধ্য করত। তারা কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে সাঁওতালদের খুব কম পারিশ্রমিক দিত। (Islam, 2021)
পঞ্চমত, সাঁওতালদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকির মুখে পড়েছিল। তাদের ধর্মীয় স্থান, বনজঙ্গল ও পবিত্র স্থান ধ্বংস করা হচ্ছিল। (Mallick, 2017, pp. 11-23)
এই সব কারণ একসাথে সাঁওতালদের বিদ্রোহ করতে বাধ্য করে, যাতে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে।
বিদ্রোহের সূচনা ও ঘটনাবলী
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতালপরগনার ভগনাডিহি গ্রামে সিধু মুর্মু, কানু মুর্মু, চাঁদ মুর্মু ও ভৈরব মুর্মু এই চার ভাইয়ের নেতৃত্বে হুল মাহার শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসক ও ভারতীয় জমিদারদের শোষণে সাঁওতালদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। মহাজনদের উচ্চ সুদের ঋণ, জমি দখল এবং ধর্মীয়-সামাজিক নিপীড়নে মানুষ অসন্তুষ্ট হয়। তাই তারা প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধাকে একত্রিত করে ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
বিদ্রোহের শুরুতে সাঁওতালরা জমিদারদের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নিজেদের জমি ফিরে পেতে চেষ্টা করে। তারা দিকুদের, অর্থাৎ বাঙালি মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সাঁওতালরা ঘোষণা দেয়, “রাজা-মহারাজাদের খতম করো”, “দিকুদের গঙ্গা পার করে দাও”, “আমাদের নিজেদের হাতে শাসন চাই”।
বিদ্রোহ দ্রুত সাঁওতাল পরগনার অনেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, ভাগলপুর ও পূর্ণিয়া জেলায় সাঁওতালরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তারা একের পর এক গ্রাম জয় করে এবং জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে।
হাজার হাজার সাঁওতাল নিহত হন এবং অনেক গ্রাম ধ্বংস হয়। (Sinha, 1977) বিদ্রোহ দমনের পর সাঁওতাল সম্প্রদায় কঠিন সময় পার করে, তবে এই আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ শাসকরা সাঁওতালদের দুর্দশা বুঝতে পারে এবং পরে সাঁওতাল পরগনা গঠন ও কিছু প্রশাসনিক সংস্কার আনতে বাধ্য হয়। এই বিদ্রোহ সাঁওতালদের ইতিহাসে গৌরবের অধ্যায় হয়ে আছে।
বিদ্রোহীদের হাতে ছিল ধনুর্বাণ, বল্লম, তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র। ব্রিটিশ বাহিনী আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও কামান নিয়ে এসেছিল। তবুও সাঁওতালদের সাহস ও দেশপ্রেম ছিল অদম্য। তারা কয়েকটি স্থানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিল।
নেতৃত্ব ও সংগঠন
হুল মাহার প্রধান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চার মুরমু ভাই—সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। সিধু মুর্মু ছিলেন বড় ও প্রধান নেতা। তিনি ১৮১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। (Sinha, 1965) কানু মুর্মু ছিলেন তার ছোট ভাই। তাঁরা খুবই দূরদর্শী ও সাহসী নেতা ছিলেন।
সিধু ও কানু ছাড়াও আরও অনেক বীর যোদ্ধা এই বিদ্রোহে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে কলিয়ান হাড়াম ছিলেন, যিনি বিদ্রোহের ইতিহাস লিখেছেন। তিনি ‘হড়কোরেন মারে হাপরামকো রেয়াঃ কাথা’ গ্রন্থে এই বিদ্রোহের বিবরণ দিয়েছেন। (Chakrabortti, 1989)
ছাত্রদের জন্য আরও গবেষণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো: শ্রীশ্রী সিদ্ধু-কানু ও সাঁওতাল বিদ্রোহ (ডাঃ নৃপেন্দ্রনাথ সিংহ), ‘Bengal District Gazetteers: Santal Parganas’ (L.S.S. O’Malley), এবং সাঁওতাল হুল নিয়ে প্রকাশিত সরকারি রিপোর্ট ও সেনা-নথিপত্র। এছাড়া, পূর্ববঙ্গ ও বিহার অঞ্চলের সমকালীন সংবাদপত্রেও এই বিদ্রোহের মূল্যবান বিবরণ আছে। এসব সূত্র পড়ে শিক্ষার্থীরা সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন।
সাঁওতালরা নিজেদের মধ্যে একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। তারা বিভিন্ন গ্রামের যোদ্ধাদের কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে সংগঠিত করত। প্রতিটি গ্রাম থেকে যোদ্ধারা নির্দিষ্ট সময়ে একত্রিত হয়ে যুদ্ধের পরিকল্পনা করত।
ব্রিটিশ প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ দমন
হুল মাহা ব্রিটিশ শাসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। জমিদার ও ব্রিটিশদের শোষণ, অতিরিক্ত কর, জমি কেড়ে নেওয়া এবং সাঁওতালদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়ন এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ। এসব কারণে সাঁওতালরা বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশরা বিশাল সেনাবাহিনী পাঠায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেনাবাহিনীর ১০ শতাংশ সৈন্য এই বিদ্রোহ দমনে নিয়োগ করেছিল। (Sinha, 1965)
১৮৫৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস ব্রিটিশ বাহিনী সাঁওতালদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান চালায়। তারা সাঁওতাল গ্রামগুলোতে আগুন দেয়, ফসল পুড়িয়ে দেয় এবং নিরীহ নারী-পুরুষদের হত্যা করে। ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের সামনে সাঁওতালদের দেশীয় অস্ত্র টিকতে পারেনি।
বিদ্রোহ চলাকালে সিধু মুর্মু বিশ্বাসঘাতকতার কারণে গ্রেপ্তার হন এবং পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। কানু মুর্মুকে ১৮৫৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভগনাডিহির কাছে ফাঁসি দেওয়া হয়। (The Illustrated London News, 23 February 1856, 1856) ফাঁসির মঞ্চ থেকে তিনি বলেছিলেন, “আমি আবার আসব, আবার সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলব”। ইংরেজ সরকার তার মৃতদেহ আত্মীয়দের কাছে দেয়নি। ভৈরব ও চাঁদ ভাগলপুরের কাছে এক ভয়ংকর যুদ্ধে প্রাণ দেন।
বিদ্রোহ দমনের সময় আনুমানিক ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ সাঁওতাল নিহত হন। (Roy, 1953) অনেকেই ঘর ছেড়ে বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ১৮৫৬ সালের জানুয়ারিতে বিদ্রোহ পুরোপুরি দমন হয়।
ফলাফল ও পরবর্তী প্রভাব
হুল মাহা সরাসরি সফল না হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল।
প্রথমত, ব্রিটিশ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগের গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং ১৮৭৬ সালে ‘সাঁওতাল পরগনা প্রজাস্বত্ব আইন’ তৈরি করে। এই আইনের ফলে সাঁওতালদের ভূমি অধিকার কিছুটা সুরক্ষিত হয় এবং জমিদারদের অত্যাচার কিছুটা কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, বিদ্রোহের কারণে সাঁওতাল পরগনা আলাদা প্রশাসনিক জেলা হয়। এতে সাঁওতালদের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।
তৃতীয়ত, এই বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম দিকের বড় বিদ্রোহগুলোর একটি। এটি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের আগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সাঁওতাল হুল মহা ও ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মধ্যে কিছু মিল ও অমিল ছিল। দুই ঘটনাতেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অনেক মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়েছিল এবং উভয় বিদ্রোহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করেছিল।
তবে, সিপাহী বিদ্রোহ ছিল মূলত সেনাবাহিনীর মধ্যে এবং সারা ভারত জুড়ে বিস্তৃত, আর সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে এবং পূর্ব ভারতে সীমাবদ্ধ। সাঁওতালদের এই বিদ্রোহ পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
চতুর্থত, হুল মাহা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি দেখায়, আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের অধিকারের জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।
হুল দিবস ও স্মরণ
প্রতি বছর ৩০ জুন ‘হুল দিবস’ বা ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনে ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও আসামের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। (Santal Hul Day Observance on June 30 in Jharkhand, West Bengal, Bihar, Odisha, and Assam, 2023)
হুল দিবসে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়, যেমন শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিছিল ও জনসভা। সাঁওতালি ভাষায় গান, নাচ ও নাটকের মাধ্যমে এই বিদ্রোহের ইতিহাস তুলে ধরা হয়।
হুল মাহা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি একটি চেতনার নাম। এটি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করার উদাহরণ। তবে কিছু ঐতিহাসিক বিশ্লেষকের মতে, এই বিদ্রোহের ফলে তৎকালীন সমাজে বড় পরিবর্তন আসেনি এবং ব্রিটিশ শাসনের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়াও, সাঁওতাল সমাজের বাইরে এই বিদ্রোহের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। (Sinha, 1977, pp. 723-735) তারপরও, বিদ্রোহটি ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
উপসংহার
হুল মাহা বা সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথম বড় সশস্ত্র সংগ্রাম। এটি শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য উদাহরণ। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
যদিও এই বিদ্রোহ পরাজিত হয়েছিল, তার চেতনা ও আদর্শ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রভাবিত করেছিল। হুল মহা আদিবাসী সম্প্রদায়ের আত্মসম্মান, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। বিদ্রোহের পর, সাঁওতালদের জীবন সহজ ছিল না। তারা এখনও নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। অনেকেই জমি ও জীবিকা হারিয়ে বনে-জঙ্গলে চলে যেতে বাধ্য হন, আবার অনেকে নতুনভাবে নিজেদের গড়ে তোলে।
পরে কিছু সংস্কার এলেও, দারিদ্র্য, দুর্বল স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অভাব অনেক বছর ধরে তাদের জীবন কঠিন করে তোলে। তবুও, সাঁওতালরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন আশায় সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। প্রতি বছর হুল দিবসে আমরা সেই বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাই এবং তাদের ত্যাগ স্মরণ করি।
হুল মাহা আমাদের শেখায়, ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। এটি বর্তমান প্রজন্মকে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে। সাঁওতালদের এই মহান বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসের একটি অমূল্য সম্পদ, যা চিরকাল স্মরণীয় থাকবে।